ছৈয়দুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ে ঈদ পূনর্মিলনী  করেরহাট আ.লীগে কামরুলের নেতৃত্ব চায় তৃনমূল নেতা-কর্মীরা  মিরসরাই আওয়ামীলীগের কাউন্সিল : সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাপ  মিরসরাইয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির হামলায় বৃদ্ধা নিহত  ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মিরসরাইয়ের তামান্না  মিরসরাইয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ড্রেন দখল চেষ্টার অভিযোগ  নামী দামি ব্রান্ডের ৫২ পণ্য বিক্রি বন্ধে আদালতের নির্দেশ  সমুদ্রের ৩৮ কি.মি গভীরে জিপির নেটওয়ার্ক মিললেও মেলে না ঘরে ভেতর  তিউনিসিয়ায় নৌকা ডুবে মৃত ৬০ জনের অধিকাংশ বাংলাদেশি  মিরসরাই আ’লীগের কাউন্সিল : আলোচনায় অর্ধ ডজন সম্ভাব্য প্রার্থী


লিডনিউজ | logo

৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং

প্রেম ও প্রতারণার গল্প

প্রেম ও প্রতারণার গল্প

সাব্বির জাদিদ,

লিডনিউজটুয়েন্টিফোর.কম (গল্প) : এক বছর পর সে ফিরল। একে ঠিক ফেরা বলে না, দেখতে আসা। আমরা এই দেখতে আসা মানুষটির নাম দিতে পারি স্বপ্না। যদিও এই নামে তাকে আর ডাকা হয় না। আপনারা জানেন, মানুষ কখন নামহীন হয়ে যায়? ভাবতে থাকুন। আমরা ততক্ষণে স্বপ্নার গল্পের দিকে নজর দিই।

স্বপ্না হাঁটছে দুলে দুলে। বাতাসে পতাকা যেমন ওড়ে আর ঢেউ খেলে, তার হাঁটায় তেমনই ঢেউখেলানো একটা ছন্দ। তার পা খালি। এক বছর আগে যখন সে গিয়েছিল, তখনও তার পায়ে স্যান্ডেল ছিল না। আজও তাই। পার্থক্য শুধু এইটুকু, যাবার সময় সে বেশ আয়োজনের ভেতর দিয়ে গিয়েছিল। সাথে ছিল অনেকগুলো বিষণ্ণ মুখ। কারো কারো চোখে পানি। কারো কারো বুকে বাষ্পের মতো আটকে থাকা আর্তনাদ। কর্পুর-আতর-লোবানের গন্ধ। আর আজ সে ফিরেছে একা। সবার চোখ এড়িয়ে। কর্পুর-আতর-লোবানের গন্ধ নেই শরীরে।

সবুজ ঘাসে পা দিয়ে স্বপ্নার বুক জুড়িয়ে গেল। ঘাস তো নয় তুলতুলে খরগোশ ছানা। কতদিন হল সে ঘাস ছোঁয় না! ঘাসের উপর নিজের ঝাপসা ছায়া দেখে সে বুঝল আজ পূর্ণিমা। চরাচর টলমল করছে আলোর বন্যায়। সে আকাশের দিকে তাকাল। মেহগনি গাছের মাথায় ফুটে আছে মস্ত চাঁদ। স্বপ্নার মনে পড়ল এমন একটা আলো ঝলমল রাতেই তার বাসর হয়েছিল। তার স্বামী মুহাম্মদ ইফতেখারউদ্দিন এমন একটা রাতের জন্যই এক সপ্তাহ ঝুলিয়ে রেখেছিল তাদের বিয়ে। আশ্চর্য, একজন জাত ব্যবসায়ী—যার সার্বক্ষণিক কাজ ক্যালকুলেটরের বোতাম টেপা আর আঙুলে থুতু লাগিয়ে টাকা গোণা—সে এমন জোছনাপাগল হয়? আশ্চর্যই বটে।

ইফতেখারের সাথে স্বপ্নার বিয়ে হয়েছিল সামাজিকভাবে। এই বিয়ের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ইফতেখারের মা মোসাম্মৎ লুৎফুন্নিসা। ভদ্রমহিলার চোখ আছে বলতে হবে। প্রথম দেখাতেই তিনি পুত্রবধূ হিসেবে স্বপ্নাকে পছন্দ করে ফেলেছিলেন। স্বপ্না তখন কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ে। ছোটবোনের জন্মদিনের কেক কিনতে সে শিশির বেকারিতে গিয়েছিল। সাথে ছিল কলেজের আরো দুজন বান্ধবী। সেই সন্ধ্যায় লুৎফুন্নিসাও গিয়েছিলেন শিশির বেকারিতে। কেন গিয়েছিলেন আজ আর তা মনে পড়ে না স্বপ্নার। তবে ভদ্রমহিলার চোখে মুগ্ধতা দেখেছিল স্বপ্না। খুব ছোটবেলা থেকেই এই ব্যাপারটায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সে। রাস্তায়, দোকানে, আত্মীয়স্বজনের বাসায় যেখানেই সে যায়, সবাই তার দিকে খানিকক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। সে যখন ওয়ান-টুতে পড়ত, আদরের ছলে অপরিচিতরাও তার গাল টিপে দিত। আর পরিচিতদের তো কথাই নেই। তারা তাকে কোলে নিত, চুমু খেত। কেউ কেউ নিতম্বের নরম মাংসে টিপ পর্যন্ত দিত। বুঝতে শেখার পর প্রথম প্রথম স্বপ্নার দিনগুলো খুব উত্তেজনাময় ছিল। তার চারপাশে ঘিরে আছে অজস্র মুগ্ধ চোখ। সবাই তাকে অবাক হয়ে দেখে। সহজে কেউ চোখ ফেরাতে পারে না। বড় ভাল লাগে স্বপ্নার। সবার মতো হয়েও সবার থেকে আলাদা মনে হয় নিজেকে।

সেই সন্ধ্যায় শিশির বেকারিতে স্বপ্নার নাম আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম জেনে নিলেন লুৎফুন্নিসা। তারপর গোয়েন্দা লাগিয়ে দুইদিনের ভেতর স্বপ্নার বাপদাদা চৌদ্দগোষ্ঠীর খবরাখবর বের করে ফেললেন তিনি। স্বপ্নারা দুইবোন। স্বপ্না আর রত্না। স্বপ্না বড়। সে কলেজে আর রত্না ইস্কুলে নাইনে। মা নেই। বাবা স্টেশনমাস্টার। শহরের ধারে পৈতৃক বাড়িতে বসবাস। মোটামুটিভাবে চলে যায় দিন। ইফতেখার পড়াশোনা শেষ করে বাবার ব্যবসা দেখছে তখন। রডসিমেন্টের ডিলার। শহরে বড় দোকান। ইফতেখার বড় কাজপাগ ছেলে। ব্যবসা ছাড়া কিছুই বোঝে না। খুব সকালে নাস্তা করে চলে যায় দোকানে। ফেরে একেবারে রাতে। দুপুরে কর্মচারি এসে খাবার নিয়ে যায়। এত অল্পবয়সে ব্যবসার নেশা মগজে ঢুকে যাওয়া সহজ কথা নয়। লুৎফুন্নিসা বুঝতেন, ছেলের পছন্দের কেউ নেই। যা করার তাকেই করতে হবে। সে যেভাবে কাজের সমুদ্রে ডুবে আছে, তার প্রেম করার সময় কোথায়। কিন্তু বিয়ের পর বউয়ের প্রতি বাড়াবাড়ি রকমের আদিখ্যেতা দেখে মনেই হবে না এই কাজপাগল ছেলেটা কোনদিন কোন মেয়ের দিকে ভালো করে তাকায়নি। সে গল্পে পরে আসা যাবে। আগে ভালোই ভালোই ইফতেখারের বিয়েটা দিয়ে নেয়া যাক।

লুৎফুন্নিসা ছেলের বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন স্টেশনমাস্টার শমসেরউদ্দিনের কাছে। এখনই মেয়ে বিয়ে দেয়ার ইচ্ছা ছিল না শমসেরের। কিন্তু প্রস্তাব এসেছে অত্যন্ত উঁচু জায়গা থেকে। ছেলে গনি ট্রেডার্সের মালিক। ইফতেখার। শমসেরউদ্দিন না করলেন না। পরের শুক্রবারের পরের শুক্রবার মোহাম্মদ ইফতেখারউদ্দিন আর রাফিজা আক্তার স্বপ্নার জীবন এক সুতোয় বেঁধে দেয়া হল। বিয়ে হল আলো কমিউনিটি সেন্টারে। ছেলেপক্ষ এবং মেয়েপক্ষ দুইপক্ষের সব খরচ বহন করল গনি ট্রেডার্স।

বাসররাতে স্বপ্নার জন্য বড় ধরনের বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। সবাই ঘুমিয়ে গেলে বাসা সুনসান পুকুরঘাট হয়ে পড়ল। ইফতেখার নতুন বউকে বলল, চল, ছাদে যাই। ইতোমধ্যে তারা প্রাথমিক পরিচয়পর্ব সেরে ফেলেছে। জড়তাও কমে এসেছে। নাকের ঘোমটা উঠে গেছে কপালের উপর। স্বামী এই বিশেষ রাতে ছাদে যেতে চায়। কিন্তু স্বপ্নার তাতে মত নেই। তাই বলে মুখের উপর ‘যাব না’ বলে দেয়া যায় না। আবার যাওয়াটাও লজ্জার। শত হোক সে নতুন বউ। কেউ যদি দেখে ফেলে! সে মুখের উপর আপত্তির চিহ্ন এঁকে তাকাল স্বামীর দিকে। ইফতেখার এই আপত্তির চিহ্নর অনুবাদ কী করল বোঝা গেল না। সে দরজার কাছে গিয়ে সিটকিনি নামিয়ে ফিরে এলো বিছানার কাছে। ভারি শাড়িতে জবুথবু বউকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে চলল ছাদে ওঠা সিঁড়ির দিকে। যেতে যেতে স্বপ্নার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, পড়ে যাবে তো। ভাল করে গলা ধর। স্বপ্না গলা না ধরে লজ্জায় মুখ লুকাতে গেল। কিন্তু মুখ লুকানোর জায়গা পাওয়া গেল না।

স্বপ্না ভেবেছিল ছাদে গিয়ে রেহাই পাওয়া যাবে। কিন্তু ছাদে তখন চাঁদের ফকফকে আলো। কোমল। ছাদের কংক্রিটে তাদের ছায়া পড়েছে। এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে সটান। তার কোলে আড়াআড়িভাবে বক্র হয়ে শুয়ে আছে এক যুবতী। ছায়ায় যুবতীর পা দুলছে। ওই দোলায়িত পা দেখেই কেবল বোঝা যাচ্ছে ছায়াটা নারী। ইফতেখার স্বপ্নাকে কোলের উপর ঘুরাতে ঘুরাতে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর নিজেও বসে পড়ল মুখোমুখি এক চেয়ারে। একটা পূর্ণবয়সের মানুষকে কোলে নিয়ে ছাদে ওঠা এবং কোলের উপর ঘোরানো বেশ পরিশ্রমের কাজ। ইফতেখার জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। মুখে বলল, আজ সারারাত আমরা চাঁদের আলো খাব আর গল্প করব। স্বপ্না মাথা তুলে চাঁদকে দেখে নিয়ে বলল, কেউ যদি এসে পড়ে! ‘আসলে আসুক’ — ইফতেখার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল শঙ্কা। স্বপ্না মুখ ভেঙাল—হু, আসলে আসুক!

স্বপ্নার এই মুখ ভেঙানো ভঙ্গিটা ইফতেখারের বড় পছন্দ হল। সে বাচ্চাদের মত জিদ করা গলায় বলল, আবার বল, আবার বল! স্বপ্না হাসতে হাসতে বলল, কী বলব? ওই যে ভেঙচি কেটে যেটা বললে। উঁহু। আর পারব না—স্বপ্না ঠোঁট উল্টাল। ইফতেখার স্বপ্নার পাশে চেয়ার টেনে বসে স্বপ্নার বাঁ-হাত নিয়ে খেলতে লাগল। খেলতে খেলতে হঠাৎ চোখ পাকিয়ে বলল, না বললে তোমার ঠোঁট কেটে নেব। তুমি হয়ে যাবে ঠোঁটকাটা টিয়া। স্বপ্নাও চোখ পাকিয়ে বলল, সাহস থাকলে কাটেন তো। ইফতেখার নিজের উরুতে থাপ্পড় মেরে হতাশ গলায় বলল, আবার সেই ‘আপনি’! আর যদি বলেছ তবে সত্যি সত্যি ঠোঁট কেটে দেব। স্বপ্না বলল, আচ্ছা, আপনিও বলব না, তুমিও বলব না। তুই-তোকারি করব। ইফতেখার স্বপ্নার মাথাটা নিজের দিকে টেনে কপালে একটা চুমু দিল—তুমি এত লক্ষ্মী কেন গো! কত্ত সহজে আপন হয়ে গেলে! স্বপ্নার শরীরের সমস্ত রক্ত—লিফট যেমন করে নিচে নামে—সরসর করে নিচে নেমে গেল যেন। এই প্রথম কোন কামুক ঠোঁট কামনা নিয়ে তাকে স্পর্শ করল। সুখের তীব্রতায় সে চোখ বুজে ফেলল। ভারি হল নিশ্বাস। তখনো সে কাঁপছে বাচ্চা কবুতরের মতো।

বিয়েপরবর্তী জীবন নিয়ে স্বপ্নার এক ধরণের ভীতি ছিল। একটা মেয়ে এক পরিবেশে, এক ধরণের মানুষের ভেতর বেড়ে ওঠে। বিয়ের পর সেই মেয়েকে একেবারে আকস্মিকভাবে সম্পূর্ণ অচেনা এক পৃথিবীকে জয় করতে হয়। কাজটা যে মোটেও সহজ নয় তা সহজেই অনুভব করা যায়। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে—বিয়ে-স্বামী-সংসার—এর প্রতিটা অধ্যায়ই বড় রোমাঞ্চের। আনন্দে স্বপ্নার চোখে পানি এসে গেল। সে পানি টলমল চোখে ইফতেখারের দিকে তাকিয় বলল, তুমি আমাকে ভুলে যাবে না তো! ইফতেখার স্বপ্নার গাল ছুঁয়ে দিয়ে বলল, পাগলী বউ! তোমাকে ভোলা এতই সোজা! তুমি তো আমার বুকপকেট। সারাজীবন বুকের সাথে লেপ্টে থাকবে। অতি অল্পদিনেই লুৎফুন্নিসার সংসারের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠল স্বপ্না। বউ-শাশুড়ির ভারি জুটি হয়েছে। ইফতেখার দোকানে চলে গেলে দুজনে বসে কুটকুট করে গল্প করে। শাশুড়ির পানের নেশা। স্বপ্না পান সাজিয়ে দেয়। শ্বশুর তো নেই। মাঝে মাঝে দুজনে মাথায় ঘোমটা তুলে গনি উদ্দিনের কবরের পাশে দাঁড়ায়। সুরা ফাতিহা, সুরা ইখলাস, দুরুদে ইবরাহিম পড়ে। এসময় লুৎফুন্নিসার চোখে অবাধ্য জল দেখে স্বপ্না বুঝতে পারে, তিনি কতটা ভালবাসতেন স্বামীকে।

ইফতেখারও পাগলের মতো ভালবাসে স্বপ্নাকে। সুযোগ পেলেই সে দোকান ফেলে ছুটে আসে বাসায়। সময় নেই অসময় নেই দুয়ার আটকে স্বপ্নার ভাষায় ‘বাঁদরামি’ শুরু করে দেয়। স্বপ্না স্বামীর বুকে দুদ্দাড় কিলঘুসি মারতে মারতে বলে, তুমি একটা ষাঁড়। রাতদিনের ফারাক বোঝ না! প্রতিটা রাতে শোয়ার আগে ওরা বসে থাকে রুমসংলগ্ন বারান্দায়। প্রশস্ত বারান্দাটা খয়েরি রঙের গ্রিলে মোড়ানো। ইফতেখারকে বলে নার্সারি থেকে অপরাজিতা আনিয়েছে স্বপ্না। বারান্দার গ্রিলে বাতাসে দোল খায় অপরাজিতার লতা। নীল-সাদা ছোট ছোট ফুলে ঝলমল করে বারান্দা। অপরাজিতা স্বপ্নার খুব প্রিয়। সে বলেছে, এই অপরাজিতা সারাজীবন থাকবে এখানে। আমি একে মরতে দেব না। ইফতেখার স্বপ্নার চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলেছে, তাই হবে গো। আজ থেকে এই অপরাজিতা আমাদের মেয়ে। সে আমাদের সাথে থাকবে, খেলবে, গাইবে, দোল খাবে। আমরা তাকে হরলিক্স খাওয়াব। ইস্কুলে দেব। সে তোমাকে মা মা বলে ডাকব। ইফতেখারের মুখে এই ধরনের কথা শুনলে স্বপ্নার বুকের ভেতর কেমন কেমন করে ওঠে। বুকটাকে মনে হয় হাঁটুজল নদী। সেই নদীতে নৌকা চলে না। বাচ্চারা গামছায় ছোটমাছ ধরে। স্বপ্না নিজেকে সামলে রাখতে পারে না । স্বামীর বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে, জানো, আমার খালি ভয় হয়। ইফতেখার অবাক হয়ে স্বপ্নার মুখ উঁচু করে ধরে বলে, কীসের ভয়? তুমি যদি ভুলে যাও আমাকে! পাগলী বউ! তোমাকে ভোলা এতই সোজা! তুমি তো আমার বুকপকেট। সারাজীবন বুকের সাথে লেপ্টে থাকবে।

জীবনটা সবসময় এমন সরলখাতে প্রবাহিত হলে স্বপ্নার গল্প বলার প্রয়োজন পড়ত না আমাদের। কিন্তু জীবন সর্বদা সরলপথে চলে না। শহুরে গলির মত প্যাঁচানো জীবনের মুহূর্তগুলো। এই বাস্তবতাকে আরো একবার প্রমাণ করতে স্বপ্নার স্তনের ভেতর চাকা বাঁধল ঘাতক-ব্যাধি। একরাতে স্বপ্না স্বামীকে দেখাল বুক খুলে। ইফতেখার পরদিন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল স্বপ্নাকে। পরীক্ষায় যখন ধরা পড়ল ক্যান্সার, বেশ দেরি হয়ে গেছে। শুরুতে টের পাওয়া গেলে স্বপ্না হয়ত বাঁচতে পারত। তবু চেষ্টার ত্রুটি করল না ইফতেখার। দেশের বাইরে নিয়ে গেল একগাদা পয়সা খরচ করে। তবু বাঁচল না স্বপ্না। বিয়ের এক বছরের মাথায় ইফতেখারকে মানসিক পঙ্গু বানিয়ে স্বপ্না ফিরে গেল তার ফেরার জায়গায়। ফিরে আসার পর ইফতেখারের খোঁজখবর আর রাখতে পারেনি স্বপ্না। ইচ্ছে থাকলেও পারেনি। ইফতেখার কেমন আছে, কীভাবে আছে , একা বিছানায় সে কেমন করে ঘুমায়—বড্ড জানতে ইচ্ছে করে। সে কি এখনো প্রতিটা রাতে বারান্দায় বসে দোল খায়? চাঁদের আলো গায়ে মাখে? অপরাজিতা গাছটা কি এখনো ছেয়ে থাকে নীল-সাদা ফুলে? একজন পুরুষমানুষ একবছরে বউ হারিয়ে কীভাবে দিনযাপন করে বড় দেখতে ইচ্ছে করে স্বপ্নার!

হাসপাতাল মোড় পার হয়ে স্বপ্না। ইস্কুল মাঠে একটু দাঁড়াল। খালি পায়ে নরোম ঘাস মাড়াতে ভাল লাগছে। ইস্কুল মাঠের পূর্বকোণে কয়েকটা মেহগনি গাছ। শীতের শেষে পাতা হারিয়ে ন্যাড়া। পাতাশূন্য ডালপালার ভেতর ঝুলছে মস্ত চাঁদ। স্বপ্না তার এককালের গত হওয়া শ্বশুরবাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। সে হাঁটছে দুলে দুলে। বাতাসে পতাকা যেমন ওড়ে আর ঢেউ খেলে, তার হাঁটায় তেমনই ঢেউখেলানো একটা ছন্দ। আশ্চর্য! পথে একটা মানুষের সাথেও দেখা হল না! এমন উথালপাতাল জোছনায় মানুষ কীভাবে ঘরে থাকে! শ্বশুরবাড়ির সীমানায় এসে স্বপ্না নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হল। এই চেনা পথ, পথের ধুলো, বাড়ির সবুজ রং, ছাদের উপর গাজী ট্যাংক, কাপড় শুকোনো রশি—সব যেন অবাক হয়ে দেখছে এবাড়ির অতীত বউমাকে। স্বপ্না থাকতে আসেনি। কারো সাথে দেখা করতেও আসেনি। সে এসেছে দেখতে। তার স্বামী ইফতেখার কি দেখতে আগের মতোই আছে? নাকি বদলে গেছে? মোটা হয়েছে না চিকন? স্বপ্না ইফতেখারের রুমসংলগ্ন বারান্দার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জোছনা রাতে ইফতেখারের বারান্দায় বসে থাকা স্বভাব। বারান্দার পাশে গেলেই সে ইফতেখারকে দেখতে পারে। কিন্তু সবকিছুতেই কেমন পরিবর্তন মনে হচ্ছে। ঠিকঠাক চিনতে পারছে না স্বপ্না। বারান্দার গ্রিলের রঙে পরিবর্তন এসেছে। আগে ছিল খয়েরি, এখন মেরেন্ডা। গ্রিলের গায়ে অপরাজিতার লতাটা নেই। ইফতেখার কি বাড়িটা বেচে দিয়েছে? সে কি অন্য কোথাও থাকে? স্বপ্না বারান্দার আরো একটু কাছে গিয়ে দাঁড়াল। এইবার দেখা যাচ্ছে। বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে অল্প অল্প দোল খাচ্ছে ইফতেখার। ইফতেখারের উরুর উপর আধবসা হয়ে আছে একটা মেয়ে। মেয়েটা স্বপ্নার চেয়েও রূপসী। ইফতেখারের মাথা মেয়েটার বুকের সাথে ল্যাপটানো। সে ইফতেখারের চুল টেনে দিচ্ছে। গাল টিপে দিচ্ছে। গোঁফ পাকিয়ে দিচ্ছে। আয়েশে চোখ বন্ধ ইফতেখারের। গোঁফওয়ালা ইফতেখারকে অচেনা লাগে স্বপ্নার।

মেয়েটা খুব অন্তরঙ্গ গলায় বলল, দেখতো, এখন কত পরিচ্ছন্ন লাগছে বারান্দাটা। এতদিন কী সব জঙলি লতাপাতায় ভরে ছিল। মা গো, অপরাজিতা কোন ফুল হল!

ইফতেখার বলল, ঠিক বলেছ রেনু। জঙলি লতাপাতার কারণে চাঁদের। আলোও ঠিকমত পৌঁছাত না বারান্দায়। এখন বেশ লাগছে। রেনু বলল, কাল নার্সারি থেকে একটা কালো গোলাপের টব আনবে। বারান্দায় সাজিয়ে রাখব। ব্লাকরোজ আমার ভীষণ প্রিয়। ইফতেখার রেনুর চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলল, তাই হবে সোনা। এই ব্লাকরোজ হবে আমাদের মেয়ে। সে আমাদের সাথে থাকবে, খেলবে, গাইবে, দোল খাবে। আমরা তাকে হরলিক্স খাওয়াব। ইস্কুলে দেব। সে তোমাকে মা মা বলে ডাকবে। রেনু ইফতেখারের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলল, জানো, আমার খালি ভয় হয়। ইফতেখার অবাক হয়ে রেনুর মুখ উঁচু করে ধরে বলল, কীসের ভয়? তুমি যদি ভুলে যাও আমাকে! ইফতেখার রেনুর গাল ছুঁয়ে দিয়ে বলল, পাগলী বউ! তোমাকে ভোলা এতই সোজা! তুমি তো আমার বুকপকেট। সারাজীবন বুকের সাথে লেপ্টে থাকবে।

স্বপ্না খুব মন খারাপ করে ফিরে গেল। এতদিন তার বুকে একটা নীল অপরাজিতা ফুটে ছিল। আজ টুপ করে ঝরে পড়ে গেল ধুলোয়।

এলএন/এসডি/ ১০ আগষ্ট ‘১৭


লিডনিউজ | logo

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    

সম্পাদক ও প্রকাশক:
ঠিকানা:
মুঠোফোন: ,ইমেইল:

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ঢাকা অফিস: ১৯২ ফকিরাপুল, (৩য় তলা),
মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।

rss goolge-plus twitter facebook
DEVELOPMENT: