স্বাধীনতা পদক পাচ্ছেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ  চলার স্বাধীনতায় সাইক্লিং  সেনা প্রত্যাহার নিয়ে ট্রাম্পের বিলম্বিত বোধোদয়!  অতিবৃষ্টিতে মাথায় হাত শরীয়তপুরের আলু চাষিদের  এমপি বাসন্তীকে নিয়ে উত্তপ্ত রামগড়!  স্ত্রীকে পিটিয়ে পিটুনি খেলেন হিরো আলম !  নৌকার প্রার্থীর গাড়িতে অস্ত্র, চালকের জেল  শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা হবে সফল মন্ত্রিসভা : ইঞ্জি. মোশাররফ  মিরসরাইয়ে মোশাররফের প্রচারনায় দাপুটে আওয়ামীলীগ : অন্ত:কোন্দলে ধরাশায়ী বিএনপি  মিরসরাই প্রেস ক্লাবের সাধারণ সভা : যোগ দিলেন ৬ সাংবাদিক


লিডনিউজ | logo

৯ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৩শে মার্চ, ২০১৯ ইং

রুশিয়ার বিয়ে : একটি সামাজিক গল্প 

রুশিয়ার বিয়ে : একটি সামাজিক গল্প 

লিডনিউজটুয়েন্টিফোর .কম

জসীম চৌধুরী (কাতার) : ঘুম থেকে জেগে বাড়ীর বাহিরে উন্মুক্ত মাঠের পাশে হাতল ভাঙ্গা পুরাতন চেয়ারটায় বসে বসে ভোর সকালের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দু’নয়নে অবলোকণ করছিলাম । কী মোলায়েম স্নিগ্ধতার পরশ চারদিকে বিরাজমান ! চকচকে সোনালী সূর্যকিরণের সাথে ঘাসের বুকে কুয়াশার মিতালী চোখে পড়ার মত । নিজের শরীরের রঙ্গেও যেন লেগেছে বাহারী পরশ। কে যেন বাড়ীর পথে এগিয়ে আসছে। কাছে এলে দেখলাম নিজ গ্রামের মুনীর হোসেন । ব্যাপার কী ! এত সকালে কেন আসছে আমার কাছে ? মুনীর হোসেন সালাম দিয়ে বলল,
‘ ভাইজান ভাল আছেন ?’
বললাম–
‘ হাঁ ভাল আছি । তুমি ভাল আছো ?’
মুনীর হোসেন অনেকগুলো দাঁত বের করে জবাব দিল–
‘ জ্বী , আমিও ভাল আছি ।’
‘ তবে আজ মনে হয় বেশী ভাল আছো ?’
‘ কেমনে বুঝলেন ভাইজান ?’
‘ তোমার এতগুলো দাঁত তো অন্য সময় দেখা যায় না , তাই বললাম।’
‘ একটা খুশীর খবর আনছি আজ ।’
‘ বলো।’—
‘ আমার বড় মেয়ের কথা ।’
‘ কি বিয়ের জন্য ঘর এসেছে –তাই না ?’
‘ ঠিকই বুঝেছেন । এইজন্যই আপনারা জ্ঞানী । একথাটা বলার জন্য আমি সকাল সকাল আপনার কাছে আসলাম।’
‘তো আজ কাজ কামে যাবেনা তুমি ?’
‘না, আজ যাবোনা।’
‘কেনো?’
‘আজ আমার বেশী বেশী খুশী লাগছে তাই ।’
‘ও আচ্ছা । আজদিনের খাবারের জন্য চাল,ডাল সব ঘরে আছে তো ?’
‘জ্বী, কাল একটু বেশী বাজার-সদাই করেছিলাম।’
‘তোমার তো চার পাঁচশ’ টাকার মধ্যে দিন কাটে । এত টাকা কই পেয়েছো?’
‘ছেলের বাবা এসেছিলেন কাল । উনি হাতের মুঠোয় পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে গেলেন।’
‘তার মানে বিয়ের কথাবার্তা পাকাপাকি ?’
‘একটু ফাঁক রেখেছি ।’
‘সেটা কেমন ?’
‘বলেছি আপনার কথা।’
‘কি বলেছ?’
‘মিয়া সা’ব তো বাড়ী নেই । শহরে গেছেন । উনি রাজী থাকলে আমার আপত্তি নেই।’
বললাম, ‘ হুঁ । আচ্ছা আসল কথা কি বলতে এসেছো –তাই বলো ।’
মুনীর হোসেন ছেলের নাম, পরিচয়, বংশ-মর্যাদা, সব খুলে বলল। আমি বললাম–
‘সব আমার জানা আছে । পাশের গ্রামের ছেলেতো, তাই সব জানি। ‘
‘তাহলে কি ভাইজান কাজটা করবো ওদের সাথে ?’
‘হাঁ করতে পার । ছেলে ভাল । মাস্টারী করে। নম্র-ভদ্র ।’
‘ওরাতো আগামী শুক্রবারে বিয়ের কাজ সারতে চায়। মাঝখানে মাত্র পাঁচদিন । ছেলের বাবা বলেছেন, বিয়ের দুইদিন আগে আরও বিশ হাজার টাকা দেবেন।’
‘তুমি চিন্তা করোনা। যাও, আগামীকাল রাতে আসিও। আর শোনো–করিম, নূরু মিয়া , সিরাজ, জহির, সাধন ও সুভাষকে আমার সাথে দেখা করতে বলিও।
”আচ্ছা ঠিক আছে—আচ্ছালামু আলাইকুম । ওয়া আলাইকুম !!

ওরা দেখা করল । নিজের কিছু ঝামেলা থাকায়– সবাইকে কাল রাতে আসতে বললাম। পরদিন রাতে ওরা ছয় জন এলো। মুনীর হোসেনসহ সাত জন। কেন ডেকেছি ওরা কিছু জানেনা। সব সময় ওরা আমার বাড়ী এসেই ব্যাপারটা জানতে ভালবাসে । আজও ওরকম। বললাম তোমরা সবাই শোনো–মুনীর হোসেনের বড় মেয়ে রুশিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে। নোয়াপাড়ার বজল সওদাগরর ছেলে কফিল উদ্দিনের সাথে । ছেলে প্রাইমারী স্কুলে মাস্টারী করে। তোমরা সবাই ওকে চেনো তো ? বুঝলাম ওরা সবাই চেনে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর আক্দ হবে। মুনীর হোসেন গরীব মানুষ হলেও কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানটা জাঁকজমক হবে। তোমাদের অনেক কাজ করতে হবে। রুশিয়া এই গ্রামের সবচেয়ে ভাল মেয়ে। সে একজন সমাজ-সেবিকা। গরীবের ঘরের শিক্ষিতা মেয়ে । এ কয় বছরে প্রত্যেক ঘরে ঘরে তার কিছু না কিছু অবদান রয়েছে। তাই এটা ওর জন্য পুরস্কার স্বরূপ । আমার এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করব– ইনশাআল্লাহ। ওর বিয়ের সব খরচ আমি দেব । তবে এ টাকা আমার বাবা মৃ্ত্যুর আগে আমার আমানতে রেখে গেছেন। ওদের দুইবোনের বিয়ের দায়িত্ব আমার । আমাদের দুইখন্ড ছোট জমি বিক্রি করে ওদের বিয়েতে খরচ করার আদেশ দিয়ে গেছেন বাবা। মুনীর হোসেন ও তার স্ত্রী আজীবন আমার মা-বাবার সেবা যত্ন করেছে। তোমরা শুনে খুশী হবে যে, এই গরীবের মেয়ে রুশিয়ার বিয়েতে আমাদের এম,পি মানে মন্ত্রী সাহেব আসবেন । উপজেলা চেয়ারম্যান গিয়াস ভাই আসবেন । তোমরাতো জানো মন্ত্রী সাহেব আমার আত্মীয় এবং উপজেলা চেয়ারম্যান আমার খুবই বন্ধু মানুষ । আমাদের মেয়র , ইউএনও সা’ব, ওসি সা’ব, প্রিন্সিপ্যাল সা’ব থেকে শুরু করে সব বড় সাহেবেরা আসবেন। আজ সবার সাথে আমার কথা হয়েছে। দুই একদিন পর বিভিন্ন অফিসগুলোতে গিয়ে বিয়ের কার্ড দিয়ে আসব । বুঝতেইতো পারছ, মন্ত্রী সা’ব যেখানে আসবেন –সেখানে অন্যরাতো আসবেনই । রুশিয়ার বিয়ে আমরা স্মরণ যোগ্য করে তুলবো।করিম,নূরু মিয়া , সিরাজ,জহির, সাধন,সুভাষ সবাই একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলো।

মুনীর হোসেন শব্দ করেই কেঁদে দিল খুশীতে । বলল,’মিয়া সা’ব, আমি একটু বাড়ীতে এই গেলাম আর এই এলাম । এ বলেই সে খুব জোরে বাড়ীর দিকে হাটাঁ শুরু করল। পনের বিশ মিনিটের মধ্যে রুশিয়ার মাকে নিয়ে হাজির । ওর স্ত্রী এসেই আমাকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে চাইল। আমি বাধা দিলাম । বললাম,আপনি আমার বয়সে বড় । অবশেষে যার যার কাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলে সবাই রাতের আঁধারে নিজ নিজ বাড়ীমুখী হল ।

পরদিন দুপুর বেলা বড় চাচা আর মুন্সী হাজীকে নিয়ে জমিখন্ডটির দাম ঠিক করলাম। ছোট ছোট দুই টুকরা জমিইতো বাবা ওদের দু’বোনের জন্য রেখে গেছেন। ধান ফসলও খুব একটা হয় না । তবুও জমি খন্ডটির দাম ছয় লক্ষ টাকা ধার্য্য করা হলো । আমি রাজী হলাম । বললাম নগদ টকা দিয়ে দেব , জমি বিক্রি করতে হবেনা ।

মঙ্গলবার আমরা সাত জন মিলে বাজারে গেলাম। দুটি বড় গরু, ছয়টি খাসী ছাগল ও পঁচিশটি মোরগসহ প্রয়োজনীয় বাজার সদাই কেনা হল।
পরদিন করিম ও সুভাষকে নিয়ে শহরে গেলাম । রুশিয়া ও বরের জন্য যাবতীয় সামগ্রী ও স্বর্ণ-অলংকার কেনা হল। সাথে মুনীর হোসেন ও তার স্ত্রীর জন্যও ভাল কাপড় চোপড় কিনলাম। মোট তিন লক্ষ টাকার মধ্যে আমরা বিয়ের সব কার্য সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করলাম।

খুব জাঁকজমকভাবে গ্রামের উঠতি বয়সী মেয়েরা মিলে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান করল। বিয়ের দিন শুক্রবার ভোর থেকে যেন সারা গ্রামে ঈদের আনন্দ বয়ে যেতে লাগল।

বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য স্কুল গৃহ ও মাঠ নির্দ্দিষ্ট করা হয়েছিল। মন্ত্রী সাহেব ছাড়া নিমন্ত্রিত অতিথিদের অনেকেই এই গ্রামের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করলেন। নামাজ থেকে বেরিয়ে এসে স্কুল মাঠে গ্রামবাসী যা দেখল তা এক অবাক করা কান্ড। এক পিক-আপ ফার্ণিচার ও গৃহ সামগ্রী বোঝাই গাড়ী দাাঁড়িয়ে আছে । মন্ত্রী সাহেব ও উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেব দুজনেরই সাহায্যে প্রায় দেড়লক্ষ টাকার উপহার আনা হয়েছে।

মন্ত্রী সাহেব পৌঁছার পর মহা সমারোহে আকদ পড়িয়ে বিয়ের কার্য সম্পন্ন করে দোয়া করা হল। মেজবানী খানার পরিবেশে নিমন্ত্রিত অতিথি ও গ্রামবাসীদের আপ্যায়িত করা হল। মন্ত্রী সাহেব নিজ হাতে কণ্যা সমর্পণ করলেন। জমি বিক্রির খরচ বাদ বাকী তিন লক্ষ টাকা মন্ত্রী সাহেবের নিজ হাতে বরকে বুঝিয়ে দেওয়া হল । বরপক্ষ ধীরে ধীরে নববধুকে নিয়ে বিদায় হয়ে শুভযাত্রা করল। সবাই আপন আপন গৃহাভিমুখী হল। আমি একটি দরিদ্র কণ্যার মুখে হাসি ফুটিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরে মহানন্দে বকুল গাছটির নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি এমনিতে খুবই আবেগ প্রবণ মানুষ । হঠাৎ হৃদয়ের ভাবাবেগ বেড়ে গেল। বুক নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে ফুলে ফুলে উঠতে লাগল । দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা সীমানা অতিক্রম করে নিম্নমুখী হচ্ছে তো হচ্ছেই । আমি খুব কাঁদলাম । আরও কাঁদলাম ।


লিডনিউজ | logo

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন    

সম্পাদক ও প্রকাশক:
ঠিকানা:
মুঠোফোন: ,ইমেইল:

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ঢাকা অফিস: ১৯২ ফকিরাপুল, (৩য় তলা),
মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।

rss goolge-plus twitter facebook
DEVELOPMENT: